জামায়াত

নতুন সংসদে জামায়াতের বার্তা: ‘ডামি’ বিরোধীদল নয়

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তার দল সংসদে গতানুগতিক বা ‘ডামি’ বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে চায় না। তিনি চান, সংসদ জনগণের সব চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দু হোক এবং সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলও দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করুক। গতকাল শনিবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এই ইফতার মাহফিলে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন। এসময় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সহ দলীয় নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।

জামায়াত আমির তার বক্তব্যে দিনটির দুটি বিশেষ তাৎপর্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদের পর গত চব্বিশের ২৬ জুলাই তরুণ যুবসমাজের নেতৃত্বে যে গণবিপ্লব হয়েছিল, তাতে দলমত নির্বিশেষে সবাই শামিল হয়েছিলেন। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ মাসের ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, যার প্রতি জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। তার মতে, গত ১৮-১৯ বছর ধরে মানুষ এমন একটি দিনের অপেক্ষায় ছিলেন।

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, দিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ২০১৩ সালের এই দিনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কুরআনের ভাষ্যকার আল্লামা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীকে একটি ‘পার্ভাটেড কোর্টে’ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর প্রতিবাদে সারাদেশে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ হয়, যা দমনে সরকার অস্ত্রের আশ্রয় নেয়। একদিনে ৭০ জন সহ এক সপ্তাহে ১৬৪ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। এমন নজির বিশ্বে বিরল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি সেই শহীদদের এবং আল্লামা সাঈদীকে আজকের দিনে স্মরণ করেন।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের আপনজনদের নামেও মামলা দেওয়া হয়। বহু অভিযুক্তকে নাজেহাল করা হয়েছে, অনেকেই আদালতের আঙিনা দেখার আগেই প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গু হয়েছেন। এ ক্ষত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। এভাবে একে একে তাদের ১১ জন নেতাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, সেদিন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এই হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং ১৬ দিন পর হরতাল ঘোষণা করেছিলেন। তিনি আজ পৃথিবীতে নেই।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে আবারও জোর দিয়ে বলেন, তারা গতানুগতিক কোনো বিরোধীদল হিসেবে সংসদে কাজ করতে চান না। তারা এমন একটি সংসদ চান যা জনগণের সব চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দু হবে। তিনি বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি নির্বাচন যেমন ‘আমি-ডামি’ ছিল, সরকার ও বিরোধীদলও তেমন ‘আমি-ডামি’ ছিল। এ ধরণের বিরোধীদল দেশের জন্য ভালো বার্তা বয়ে আনতে পারে না। তিনি সরকারি দলের সব সঙ্গত পদক্ষেপে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তবে, সরকারের কোনো অসঙ্গত সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ দেখলে, প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সহযোগিতার চেষ্টা করবেন। সরকার তাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে জাতি উপকৃত হবে, আর না গ্রহণ করলে বিরোধীদলের যে ভূমিকা সেটাই তারা পালন করবেন এবং জাতির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবেন।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই সরকার এই সংসদকে আগামীতে এগিয়ে যাওয়ার বাহনে পরিণত করবে। তার মতে, কোনো বাহন এক চাকায় চলে না, দুটি চাকা প্রয়োজন হয়। সরকারি দল যদি সামনের চাকা হয়, তাহলে বিরোধীদল হবে পিছনের চাকা। তিনি সংসদকে কারো চরিত্র হননের কেন্দ্রবিন্দু না বানিয়ে দেশের সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সংবিধানে থাকা কালো আইনগুলো সম্মিলিতভাবে সংশোধনের এবং জাতির জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংযোজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

ইফতার মাহফিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সরকারের মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্য, জামায়াত সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমপি ও নেতা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সাবেক বিচারপতি ও সিনিয়র আইনজীবী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, ওলামা-মাশায়েখ, কবি সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের নির্বাচিত নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button