দলীয় রাজনীতিতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে দলীয় রাজনীতির মাধ্যমে বিকৃত করার অভিযোগ তুলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তার মতে, ইতিহাসের এই বিকৃতি জাতি হিসেবে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে আশুগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সোপান। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী ভাষার জন্য সংগ্রাম করেনি বা জীবন দেয়নি, যা বাংলাদেশকে অনন্য করে তুলেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা সবকিছুতেই রাজনীতি করি। তিনি অভিযোগ করেন, যখন যে সরকার বা দল ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের মতো করে ইতিহাস রচনা করে, ফলে ইতিহাসে আমরা হয় দেবতা, নয়তো ইবলিস – এই দুইয়ের মাঝখানে সাধারণ মানুষকে খুঁজে পাই না। মূলত সরকার এসেছে, সরকার গেছে; কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস কোথাও সঠিকভাবে লেখা হয়নি।
ব্যারিস্টার ফারহানা তার পিতা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের সংগ্রামী অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, পাঠ্যসূচির বইগুলোতে ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস প্রতিফলিত হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, আশির দশক পর্যন্ত ইতিহাসকে ততটা দলীয়করণ বা বিকৃত করা হয়নি। সে সময়ে সরকার ভাষা আন্দোলনে তার বাবার মুখ্য চরিত্র হিসেবে যে ভূমিকা বা তার প্রাপ্য সম্মানটুকু, তা মুছে ফেলার চেষ্টা করেনি। কিন্তু আশির দশকের পর দলীয় সরকার হিসেবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ আসার পর ভাষা আন্দোলনের সত্যিকারের নায়কদের ছবি ধীরে ধীরে মুছে যেতে দেখা গেছে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ৫ আগস্টের পর (সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত) বাংলাদেশে একটি নতুন রূপ পেয়েছে এবং সেই বাংলাদেশে এ যাবত যাদের অবদান রয়েছে, তাদের সম্মান ও স্বীকৃতি ইতিহাসে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে।
আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব রাফে মোহাম্মাদ ছড়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল আলম, উপজেলা জামায়াতের আমির মো. শাহজাহান ভূঁইয়া, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আশুগঞ্জের মুখ্য সমন্বয়ক আমিনুল ইসলাম ডালিম, সরকারি হাজি আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবির, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান এবং নাসির মুন্সি সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ। আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার এই বক্তব্য দেশের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উস্কে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ও নিরপেক্ষ ইতিহাস জানতে পারে, সেদিকে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল ও সাধারণ জনতা।





