হাজারো কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে নতুন এই ধানের জাত! যা ঘটল গাজীপুরে

গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অবশেষে আলোর মুখ দেখল উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি এবং চিকন আউশ ধানের নতুন জাত ‘জিএইউ ধান-৪’। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকরা প্রায় এক দশকের গবেষণা শেষে এই অভাবনীয় সাফল্য এনেছেন। প্রায় এক দশক ধরে চলা নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সম্প্রতি জাতটি জাতীয়ভাবে অনুমোদন লাভ করেছে। উদ্ভাবকরা আশাবাদী, এই নতুন জাত একদিকে যেমন কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে, তেমনি দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাকেও আরও মজবুত করবে। শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম ময়নুল হক এবং অধ্যাপক মসিউল ইসলামের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এই নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উদ্ভাবিত ধানের জাতের সংখ্যা দাঁড়ালো চারটিতে। আর সব মিলিয়ে ফসলের মোট উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৯৫টি। সাধারণত, বাংলাদেশের অন্যান্য আউশ ধানের জাতের তুলনায় আমন ও বোরো মৌসুমের ধানের ফলন বেশি হয়ে থাকে। তবে, ‘জিএইউ ধান-৪’ এই প্রথাগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন খোদ গবেষকরা। এই জাতটি যেহেতু স্বল্প সময়ে পরিপক্ব হয়, তাই এটি কৃষকদের দ্রুত জমি খালি করে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ করে দেবে। বিশেষ করে, দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকায় এই নতুন জাতটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, এই নতুন জাতটি উদ্ভাবনের জন্য প্রচলিত আউশ ধান ‘পারিজা’ এবং উচ্চফলনশীল চিকন জাত ‘বিইউ ধান-২’ এর মধ্যে সংকরায়ন ঘটানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা ও বিভিন্ন ধাপে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় ‘জিএইউ ধান-৪’ জাতটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পায়।
শুধু ফলনই নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও এই নতুন ধানের চাল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এতে অ্যামাইলেজ এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ২৪.৫৮ শতাংশ এবং প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৮.৩৮ শতাংশ। সুস্বাদু এই চাল সহজে হজমযোগ্য এবং মানবদেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই ধানের দানা লম্বা ও চিকন হওয়ার পাশাপাশি, বীজ বপনের মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। অনুকূল পরিবেশে প্রতি হেক্টরে পাঁচ থেকে ৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া, প্রতি হেক্টরে ২৫-৩০ কেজি বীজই যথেষ্ট, যা কৃষকদের জন্য একটি ব্যয়সাশ্রয়ী বিকল্প।
গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, ‘জিএইউ-৪’ জাতটি রোগবালাই প্রতিরোধী হওয়ায় সাধারণ জাতগুলোর তুলনায় গড়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। পাশাপাশি, কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় এটি জলবায়ু সহনশীল এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য চাষযোগ্য। উদ্ভাবক ড. মসিউল ইসলাম বলেন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের প্রত্যাশা, এই জাতটি কম সময়ে বেশি ফলন দিয়ে বাজারে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান নতুন এই জাত উদ্ভাবনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এটি দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।





