বিডিআর বিদ্রোহের ভয়াবহ স্মৃতি: বিচার প্রক্রিয়া নষ্ট না করার আহ্বান, বিডিআর নাম পুনঃবহাল

ডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে ঘটে যাওয়া পিলখানা বিদ্রোহের ভয়াবহ স্মৃতি আজও জাতি ভুলতে পারেনি। ওই দুই দিনের নির্মম হত্যাযজ্ঞে বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালকসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা এবং নারী ও শিশুসহ মোট ৭৪ জন নিহত হয়েছিলেন। সম্প্রতি এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট না করার আহ্বান জানিয়েছেন সে সময়ের সেনা প্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ।
হাইকোর্টে জমা হওয়া মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল তৎকালীন বিডিআরের বার্ষিক দরবারের দিন। সকাল ৯টায় সদর দপ্তরের দরবার হলে অনুষ্ঠান শুরু হয়। মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ বক্তব্য দিচ্ছিলেন। সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে মঞ্চের পেছন থেকে সশস্ত্র দুই বিদ্রোহী জওয়ান অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করলে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই দরবার হলের বাইরে থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসে এবং লাল-সবুজ কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা বিদ্রোহী জওয়ানরা হল ঘিরে ফেলে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্রোহীরা কর্মকর্তাদের দরবার হল থেকে সারিবদ্ধভাবে বের করে আনেন। ডিজির নেতৃত্বে কর্মকর্তারা বাইরে পা রাখা মাত্রই মুখে কাপড় ও মাথায় হলুদ হেলমেট পরা চার বিদ্রোহী ডিজিকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এরপর আরো কয়েকজন কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দিনভর পিলখানার ভেতরে ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে। সন্ধ্যায় পিলখানার বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের লাশ মাটিতে পুঁতে ও সরিয়ে ফেলা হয়।
এই ঘটনার পর তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ সম্প্রতি ইউটিউবে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, “এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করবেন না। যে সমস্ত সদস্য শাস্তি পেয়েছে, তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।” তিনি দাবি করেন, তদন্তে সরকার তেমন সহায়তা করেনি। তবে পেছনের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ক্ষত আজও বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। স্বজন হারানো পরিবারগুলো আজও ন্যায়বিচারের আশায় বুক বেঁধে আছে। পিলখানা বিদ্রোহের বিচার প্রক্রিয়া এখনো বিভিন্ন ধাপে চলমান। জাতি আশা করে, এই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের পেছনের সকল রহস্য উন্মোচিত হবে এবং দোষীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
আজ, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিভীষিকাময় সেনা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পূর্তি। এই শোকাবহ দিনে বর্তমান সরকার পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনায় নতুন করে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। একইসাথে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বের অঙ্গীকার অনুযায়ী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর নাম পরিবর্তন করে ‘বিডিআর’ ফিরিয়ে আনা এবং এই দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালনের পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক চার দিন আগে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ‘বিডিআর’ নাম ও ইউনিফর্ম পুনর্বহাল করা হবে। পাশাপাশি, পিলখানার সেনা হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’ অথবা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার গঠনের পর এই পরিকল্পনা কতদূর এগিয়েছে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অনুবিভাগের যুগ্মসচিব রেবেকা খান জানান, নাম পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে হয়েছে। তবে ফাইল প্রক্রিয়া শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে, সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে চাহিদা এলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা করেছিল। এই শোক দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ সেনা সদস্যদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন। দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা ধরনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
১৭ বছর আগের এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ ১১ মাস ধরে তদন্ত করে সরকারের কাছে রিপোর্ট দাখিল করে। সেই রিপোর্টে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এল এম ফজলুর রহমান বলেছিলেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। রিপোর্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরের জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে।
তবে বর্তমান সরকার সেই রিপোর্টে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একদিন আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নতুন করে তদন্ত করবে সরকার। এই নতুন তদন্তের ঘোষণা জাতি হিসেবে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সত্য উন্মোচনের আশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পুরনো ক্ষত পুনরায় জেগে ওঠায় অনেকেই উদ্বেগে আছেন।
গত বছরের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছিলেন, “এই বর্বরতা কোনো সেনাসদস্য করেনি। সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্য দ্বারা সংঘটিত। ফুলস্টপ। এখানে কোনো ‘ইফ’, ‘বাট’ (যদি, কিন্তু) নাই।” তার এই মন্তব্য অতীতের বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানোর গুরুত্ব তুলে ধরেছিল। এখন নতুন তদন্তের ঘোষণা সেই পূর্বের বক্তব্যের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭ বছর পর নতুন করে তদন্তের ঘোষণা এবং বিজিবিকে পুনরায় বিডিআর নামে ফিরিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্ত, দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। জাতি এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই নতুন তদন্তের ফলাফলের জন্য, যা এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকা সমস্ত সত্যকে জাতির সামনে উন্মোচন করবে এবং শহীদদের পরিবারগুলো পাবে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার ও শান্তি। এই পরিবর্তনগুলো দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও জাতীয় স্মৃতির ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।





