জাতীয়

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো রণকৌশল: খলিফা যেভাবে চার সেনাপতিকে পাঠালেন শাম অভিযানে!

ইসলামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় খলিফা আবু বকরের (রা.) দূরদর্শী রণকৌশল। তিনি শুধু একটি বিশাল বাহিনীর পরিবর্তে চারটি ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী শাম অভিমুখে প্রেরণ করে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আধুনিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কৌশল মুসলিম বাহিনীর বিজয়ে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চারটি ছোট ছোট বাহিনী ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করায় বাইজেন্টাইন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা মুসলিম বাহিনীর মূল লক্ষ্য বুঝতে পারেনি, ফলে বিশাল শাম অঞ্চল জুড়ে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। এটি তাদের মূল শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এছাড়াও, বাইজেন্টাইনদের বড় শহর কেন্দ্রিক মজবুত প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে গ্রাম ও মরুভূমি সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলগুলো দখলে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল আবু বকর (রা.)-এর। চারটি বাহিনী আলাদা রুট দিয়ে প্রবেশ করায় বাইজেন্টাইনদের পারস্পরিক যোগাযোগের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

আবু বকর (রা.) সেনাপতিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন, তবে একটি কঠোর নির্দেশও দিয়েছিলেন – যদি কোনো একটি বাহিনী বড় আক্রমণের মুখে পড়ে, তবে অন্য সবাইকে তার সাহায্যে এগিয়ে যেতে হবে। এই ‘ডিসেন্ট্রালাইজড কমান্ড’ বা বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা ছিল তৎকালীন সময়ের জন্য এক অনন্য উদাহরণ।

জুরফ থেকে একে একে চারটি বাহিনী যাত্রা শুরু করে: প্রথমে ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের, তারপর শুরাহবিলের, এরপর আবু উবাইদা এবং সবশেষে আমর ইবনুল আসের বাহিনী। এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রা সত্ত্বেও মুসলিম সেনাদের মনোবল ছিল অটুট। শাম সীমান্তে পৌঁছে তারা বাইজেন্টাইনদের অনুগত আরব গোত্রগুলোর মুখোমুখি হয়, যাদের মধ্যে কেউ কেউ মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল।

শাম সীমান্তে পৌঁছানোর পর থেকেই বাইজেন্টাইন গ্যারিসনগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। দাথিনের যুদ্ধে আমর ইবনুল আসের বিজয় সমগ্র শাম অঞ্চলে এই বার্তা ছড়িয়ে দেয় যে, মুসলিমরা শুধু লুটপাটে আসেনি, বরং স্থায়ী বিজয় নিশ্চিত করতে এসেছে। একই সময়ে ইয়াজিদ, শুরাহবিল এবং আবু উবাইদা’র বাহিনীও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখলে নেয়।

এই প্রাথমিক বিজয়গুলো সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে সজাগ করে তোলে। তিনি মুসলিমদের এই সুবিন্যস্ত আক্রমণকে মোকাবিলা করার জন্য বিপুল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেন। কিন্তু পরিস্থিতি মুসলিম বাহিনীর জন্য প্রতিকূল হতে দেখে সেনাপতিরা মদিনায় বর্ধিত সাহায্য প্রার্থনা করেন। খলিফা আবু বকর (রা.) পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তাদের ইয়ারমুক নদীর তীরে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি ইরাক ফ্রন্ট থেকে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে শাম ফ্রন্টে আসার নির্দেশ পাঠান। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন – তিনি মরুভূমির দুর্গম ও পানিশূন্য পথ দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশের এক মহাযাত্রা শুরু করেন। পরবর্তী পর্বে উঠে আসবে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সেই কিংবদন্তিতুল্য মরুভূমি অভিযান এবং বাইজেন্টাইনদের দর্প চূর্ণ করার রোমহর্ষক কাহিনি।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button