হাসপাতাল নয়, যেন মৃত্যুপুরী! যা ঘটেছিল ১৯৭১ সালে…

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের পাশাপাশি মানবতা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য অধ্যায় রচিত হয়েছিল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও এই হাসপাতালের চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বাজি রেখে আহতদের সেবা দিয়েছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, ওষুধের সংকট এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করেও তারা এই মানবিক সংগ্রামে অবিচল ছিলেন।
সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে হাসপাতালে গঠিত হয় জরুরি ব্লাড ব্যাংক ও ইমার্জেন্সি স্কোয়াড, যা পরবর্তীতে অসংখ্য জীবন বাঁচাতে সহায়ক হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যার পর সিলেটেও রক্তপাত শুরু হলে তিনি দিনরাত হাসপাতালে থেকে আহতদের চিকিৎসা দেন এবং শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানান। কেবল তাই নয়, মানবতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি হাসপাতালে ভর্তি আহত পাকিস্তানি সৈন্যদেরও চিকিৎসা দেন এবং তাদের উপর আক্রমণ না করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধ করেন।
যুদ্ধ তীব্রতর হলে এবং বেশিরভাগ চিকিৎসক শহর ছেড়ে আশ্রয় নিলেও ডা. শামসুদ্দীন আহমদ হাসপাতাল ছাড়েননি। তার সঙ্গে ছিলেন ডা. শ্যামল কান্তি লালা, কোরবান আলী, মাহমুদুর রহমানসহ কয়েকজন সাহসী সহকর্মী। কিন্তু ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পাকিস্তানি সেনারা তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। শহীদ হন ডা. শামসুদ্দীন আহমদ, ডা. শ্যামল কান্তি লালা, কোরবান আলী, মাহমুদুর রহমানসহ অনেকে। একই সাথে কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. আবুল ফজল জিয়াউর রহমানকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যিনি পরে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে মেডিকেল কোরে যোগ দেন, শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করেন এবং অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। কলেজের ছাত্র-কর্মচারীরা গোপনে ওষুধ, ব্যান্ডেজ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন, যেখানে ধরা পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা থেমে থাকেননি।
আজ সেই হাসপাতালের প্রাঙ্গণ একটি সংরক্ষিত বধ্যভূমি ও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। তবে এই অসামান্য আত্মত্যাগ ও অবদান আজও জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি, যা নতুন প্রজন্মের জন্য এক নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার শক্ত ভিত্তি হতে পারে।





