জাতীয়

ঈদযাত্রায় ১৪৮ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া: চাপে সাধারণ মানুষ!

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি অভিযোগ করেছে যে এবারের ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় গত ২০ বছরের সব রেকর্ড ভাঙতে চলেছে। সমিতি জানায়, এ বছর বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া বাবদ প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা আদায় হতে পারে। এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে তাদের এক সংক্ষিপ্ত সমীক্ষায়, যা বুধবার (১৮ মার্চ) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় তুলে ধরেন সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারি নির্দেশনা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বাস-মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। এমনকি বুধবার থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটিবাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। নৌপথের বেশির ভাগ রুটেও একই নৈরাজ্যের চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে সমিতি অভিযোগ করেছে। তাদের মতে, সরকার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে মালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির সমীক্ষা অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। এছাড়াও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটি সার্ভিসের বাসে আরো প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ১৪ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকার যাতায়াত, অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ, সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।

সমিতির বার্তায় জানানো হয়, এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা থেকে পাবনার নিয়মিত ৫৫০-৬০০ টাকার বাস ভাড়া ১২০০ টাকা, ঢাকা থেকে নাটোরের নিয়মিত ৫৫০-৫৮০ টাকার বাস ভাড়া ১২০০ টাকা, এবং ঢাকা থেকে রংপুরের নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ১৫০০ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। এছাড়া, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ লোকাল বাসে ২৫০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা এবং ট্রাক-পিকআপে জনপ্রতি ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ভাড়ার এই হার প্রতিদিন বাড়ছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৫২ আসন বিশিষ্ট লোকাল বাস ও ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ভিন্ন হলেও, অসাধু পরিবহন মালিকেরা যাত্রীদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া হারে ৫২ আসনের বাসেও একই হারে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। সিএনজিচালিত ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়ার হার ভিন্ন হলেও ঈদযাত্রার বহরে সবাই সমহারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। এমনকি কিছু নামিদামি কোম্পানির বাসেও কৌশল করে বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের টিকিট না দিয়ে দূরের টিকিট (যেমন ঢাকা-চট্টগ্রামের পরিবর্তে সাতকানিয়া বা চকরিয়া) কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি বৃদ্ধি, পরিবহন কোম্পানিগুলোর বাড়তি খরচের জোগান, এবং মালিক-চালক-সহকারীদের ঈদ বোনাস সংগ্রহ না করা ইত্যাদি কারণে বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহন একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। সমিতি আরো উল্লেখ করেছে যে, সরকার বাস-লঞ্চ ও অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণকালে চালক-সহকারী ও ভাড়া আদায়কারীর বেতন-ভাতা এবং দুই ঈদের বোনাস প্রতিদিনের আদায়কৃত ভাড়ায় ধার্য করলেও দেশের কোনো পরিবহন মালিক তা পরিশোধ করেন না। সড়ক ও নৌ পথের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় মনিটরিং ভিজিল্যান্স টিমে যাত্রী সংগঠন না রাখায় এমন নৈরাজ্য থামাতে যাত্রীস্বার্থ দেখার কেউ নেই।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদে দূরপাল্লার ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর ৮৭ শতাংশ যাত্রীপ্রতি গড়ে ৩৫০ টাকা হারে বাড়তি ভাড়া গুনলে প্রায় ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় হবে। এছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সিটিবাসে ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর ৮৭ শতাংশ যাত্রীপ্রতি গড়ে ৫০ টাকা হারে বাড়তি দিলে ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। সব মিলিয়ে, এবারের ঈদে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা শুধু বাস-মিনিবাসে বাড়তি ভাড়া আদায় হবে।

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গণপরিবহনে ডিজিটাল লেনদেনে ভাড়া আদায় চালু করা, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ করা, সড়ক-মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা পদ্ধতিতে প্রসিকিউশন চালু করা ও আইনের সুশাসন নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সাধারণ মানুষ এই ভয়াবহ আর্থিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button