মধ্যপ্রাচ্যে নতুন জোটের উত্থান: ইরান-ইসরাইলের প্রভাব কি কমছে?

আমেরিকা ও ইরানের চলমান সংঘাত বন্ধে মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে ইসলামাবাদে। এই বৈঠককে একদিকে যুদ্ধবিরতির সেরা সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তেমনই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের প্রভাব সীমিত করার প্রাথমিক ধাপ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও চারটি দেশ এর আগেও জোটবদ্ধভাবে আলোচনায় বসেছে, তবে এবারের বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন এবং আমেরিকা ও ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানো।
ক্রাইসিস গ্রুপের উপসাগরীয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন ফারুকের মতে, এই চারটি দেশ যুদ্ধবিরতিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে, কারণ যুদ্ধ ইতিমধ্যে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। উপসাগরীয় দেশগুলো শুরুতে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা হলে তা বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
এদিকে, ইসলামাবাদের ইরান-পাকিস্তান চুক্তি পাকিস্তানের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে, যা ইসলামাবাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এই আলোচনার পর ইসলামাবাদ ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে যাতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার পথ খোলা থাকে।
অনেক প্রতিবেদনের বিপরীতে, এই চারটি মুসলিম দেশের এক টেবিলে আলোচনা বিস্ময়কর। যদিও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সৌদি আরব গোপনে ইরানকে ধ্বংস করতে আমেরিকাকে উৎসাহ দিচ্ছে, তবে এই যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ থেকে বোঝা যাচ্ছে সৌদি আরব বিকল্প পথ খোলা রেখেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো চায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হামলা এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণ দিক।
এই জোটে কাতারের কোনো প্রতিনিধি নেই, যারা তুরস্কের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কাতার এখনো রাশিয়ার লিকুইড গ্যাস সুবিধায় হামলাকে ইরানের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, দোহা যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে, কিন্তু ইরানের হয়ে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চাইছে না।
এই জোটের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশ হলো তুরস্ক। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নয়, বরং পুরো অঞ্চলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রক্সি গ্রুপের সমর্থন নিয়ে আলোচনা চালানোর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক ইব্রাহিম কালিন মনে করেন, এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং এটি কুর্দি, তুর্কি, আরব ও পারস্যদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ও সংঘাতের পথ প্রশস্ত করবে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধের দায়ভার যাদের, তাদের ভোলানো যাচ্ছে না।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইসরাইলের লক্ষ্য মুসলিম দেশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করা, যাতে তারা ইরানবিরোধী জোটকে বিস্তৃত করতে পারে। তিনি যুক্তি দেন, আমেরিকার জনগণ যুদ্ধ চায় না এবং ইসরাইলের ওপর চাপ দেওয়ার কোনো কার্যকর পন্থা আমেরিকার কাছে নেই। যদি আমেরিকা ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তবে তাদের ইসরাইলের ওপর কঠোর প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।





