আন্তর্জাতিক

রমজানেও থামছে না রক্তপাত: গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আবারও প্রাণহানি, থমকে যাচ্ছে শান্তির আশা

শনিবার রমজানের তৃতীয় দিনে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। চার মাস আগে হামাসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের এটি সর্বশেষ ঘটনা। এই হামলায় গাজায় চলমান অস্থিরতা এবং শান্তির আলোচনা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।

জানা গেছে, শনিবারের হামলাগুলো উত্তর গাজার জাবালিয়া ক্যাম্প এবং দক্ষিণ গাজার কিজান আন-নাজ্জার এলাকায় চালানো হয়। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরায়েলের “যুদ্ধবিরতি” কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আরও ১,৬৪০ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান গাজার সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবের চিত্র তুলে ধরে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে একটি হামলার কথা স্বীকার করে দাবি করেছে যে, তাদের সেনারা উত্তর গাজার বিভাজন রেখা অতিক্রম করে ইসরায়েলের দিকে আসা এক যোদ্ধাকে হত্যা করেছে, যিনি তাদের সৈন্যদের জন্য “তাৎক্ষণিক হুমকি” সৃষ্টি করেছিলেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে যে, তারা “যেকোনো তাৎক্ষণিক হুমকি অপসারণে কাজ চালিয়ে যাবে।”

এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ গাজায় পুনর্গঠন, নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রথম বৈঠক করে। বৈঠকে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ৯টি দেশ গাজার পুনর্গঠনে ৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। তবে বিধ্বস্ত এই ফিলিস্তিনি অঞ্চল পুনর্গঠনে আনুমানিক ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার তুলনায় বর্তমান প্রতিশ্রুতি অপ্রতুল।

ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, পাঁচটি দেশ ২০,০০০ সদস্যের একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ISF) গঠনে সৈন্য পাঠাতে সম্মত হয়েছে, যা হামাসের কাছ থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। তবে চুক্তির পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী হামাসকে নিরস্ত্র করার কাজটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত বা ব্যাহত করার হুমকি দিচ্ছে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেছেন যে, যেকোনো পুনর্গঠন শুরুর আগে হামাসকে অবশ্যই নিরস্ত্র হতে হবে। অন্যদিকে, হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েল যতক্ষণ পর্যন্ত গাজা দখল করে থাকবে এবং আগ্রাসন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করবে, ততক্ষণ তারা অস্ত্র পরিত্যাগ করবে না। হামাস যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণকারী এবং দখলদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের জনগণের মধ্যে বাফার হিসেবে কাজ করবে এমন একটি শান্তিরক্ষা বাহিনীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও, গাজার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা যাবে না বলে শর্ত দিয়েছে।

অনেক ফিলিস্তিনিই এই শান্তি পরিকল্পনার সাফল্য নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান। তাদের মতে, ইসরায়েলের লাগাতার হামলা এবং সাহায্য সামগ্রীর অব্যাহত সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাল আস-সুলতান থেকে বাস্তুচ্যুত ৭০ বছর বয়সী আওয়াদ আল-গুল বলেন, “ইসরায়েল প্রতিদিন মানুষ মারছে, বোমা ফেলছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে এবং বাফার জোন বিস্তৃত করছে, অথচ কেউ তাদের আটকাচ্ছে না। তাই এই প্রকল্পটি শুরু থেকেই ব্যর্থ এবং এর লক্ষ্য অস্পষ্ট।”

এই পরিস্থিতিতে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ক্রমশই সুদূর পরাহত বলে মনে হচ্ছে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button