ট্রাম্পের ইরান নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: পদত্যাগ করলেন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা!

আমেরিকার শীর্ষ কাউন্টার-টেররিজম কর্মকর্তাদের একজন, জো কেন্ট, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে লেখা তার পদত্যাগপত্রটি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
‘ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টার’-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত জো কেন্ট তার পদত্যাগপত্রে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সজ্ঞানে ইরানের বিরুদ্ধে এই চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারছেন না। তার মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না, বরং ইসরায়েল এবং তাদের শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর থেকে যুদ্ধ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কেন্টের এই পদত্যাগ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্টের ৪৫ বছর বয়সের জীবন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ভরপুর। তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সে কাজ করেছেন এবং ইরাক যুদ্ধসহ মোট ১১ বার যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন। সামরিক বাহিনী ছাড়ার পর সিআইএ-তে কাজ করে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। একজন কট্টর রিপাবলিকান ও ট্রাম্প সমর্থক হয়েও তার এই বিদ্রোহ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৯ সালে সিরিয়ায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়, যা তার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
জো কেন্ট মাত্র আট মাসেরও কম সময় এই গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। জুলাই মাসে তার নিয়োগ নিশ্চিত হয়েছিল মূলত রিপাবলিকানদের সমর্থনে। তিনি ট্রাম্পের সেই বিদেশনীতির সমর্থক ছিলেন, যা ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখার অঙ্গীকার করেছিল। পদত্যাগপত্রে তিনি দাবি করেন, ইরানের হুমকি নিয়ে ট্রাম্পকে ভুল বোঝানো হয়েছে এবং এর জন্য সংবাদমাধ্যম, উচ্চপদস্থ ইসরাইলি কর্মকর্তা ও লবিস্টদের দায়ী করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, একই ভুল করে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপর্যয়কর ইরাক যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এবং এর পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।
কেন্টের পদত্যাগকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরে বিভেদ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন্টের পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, তিনি সবসময় কেন্টকে নিরাপত্তার বিষয়ে ‘দুর্বল’ মনে করতেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট কেন্টের দাবিগুলোকে ‘অপমানজনক ও হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে রক্ষণশীল বিশ্লেষক টাকার কার্লসন কেন্টের সাহসিকতার প্রশংসা করে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সে এমন একটি চাকরি ছেড়েছে যা তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল। নিও-কনরা (নব্য রক্ষণশীল) তাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে।’
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল কোয়ার্কের মতে, এমন উচ্চপর্যায়ের পদত্যাগ প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা, তবে ট্রাম্পের ইরান নীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আল জাজিরার প্রতিনিধি মাইক হ্যানা উল্লেখ করেছেন, জো কেন্ট ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) সমর্থকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। তাই তার এই সমালোচনা ট্রাম্পের অনুসারীদের মধ্যে মোহভঙ্গের ইঙ্গিত হতে পারে এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। একজন যুদ্ধফেরত সৈনিক ও ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হয়েও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দিয়ে ট্রাম্পকে যুদ্ধে প্রভাবিত করার অভিযোগ আনা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
জো কেন্টের এই পদত্যাগ কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির গভীর সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের প্রতিচ্ছবি। এটি মার্কিন-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আসন্ন নির্বাচনের আগে এই ঘটনা রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভেদ আরও বাড়াতে পারে এবং মার্কিন ভোটারদের মনে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি করতে পারে।





