১০ দিনের আল্টিমেটাম দিলেন ট্রাম্প, ইরানের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি: মধ্যপ্রাচ্যে ফের সংঘাতের আশঙ্

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরানকে আগামী প্রায় ১০ দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, অন্যথায় আরও সামরিক হামলার মুখোমুখি হতে হবে। চলমান পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই ট্রাম্পের এই কড়া হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং সংঘাতের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী বোর্ড অফ পিস মিটিংয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পুরোনো যুক্তি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, গত বছরের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা গাজায় “যুদ্ধবিরতি”র পথ তৈরি করেছিল। ট্রাম্প যুক্তি দেন যে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা না হলে, ইরানের “হুমকি” মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে “শান্তি প্রতিষ্ঠায়” সম্মত হতে বাধা দিত।
ট্রাম্প বলেন, “সুতরাং, এখন হয়তো আমাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে হতে পারে, অথবা নাও হতে পারে। হয়তো আমরা একটি চুক্তি করতে যাচ্ছি। আগামী সম্ভবত ১০ দিনের মধ্যেই আপনারা জানতে পারবেন।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনা শেষ করেছে। গত বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় “ভালো অগ্রগতি” হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে তারা একটি চুক্তির জন্য “কয়েকটি মূলনীতিতে ব্যাপক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছেন”।
তবে আলোচনার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে, যার মধ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান রয়েছে। অন্যদিকে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের খোঁজে থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং বলেছে যে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অধীনে রাখতে রাজি আছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের কোনো ধরনের সমৃদ্ধকরণের বিরোধিতা করেছে। ওয়াশিংটন তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ওপরও সীমা আরোপ করতে চাইছে, কিন্তু ইরানি কর্মকর্তারা এই বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি তাদের অলঙ্ঘনীয় প্রতিরক্ষা নীতি।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, তার কূটনৈতিক সহযোগী স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে “খুব ভালো বৈঠক” হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের একটি অর্থপূর্ণ চুক্তি করতে হবে। অন্যথায়, খারাপ কিছু ঘটবে।” গত সপ্তাহেও ট্রাম্প বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের “আগামী মাসের মধ্যে” একটি চুক্তিতে আসা উচিত এবং তেহরানকে “খুব মর্মান্তিক” পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। বৃহস্পতিবার এক্সে (আগের টুইটার) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি লিখেছেন, “মার্কিনরা ক্রমাগত বলছে যে তারা ইরানের দিকে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। অবশ্যই, একটি যুদ্ধজাহাজ একটি বিপজ্জনক সামরিক সরঞ্জাম। তবে, সেই যুদ্ধজাহাজের চেয়েও বিপজ্জনক হলো সেই অস্ত্র, যা ওই যুদ্ধজাহাজকে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে দিতে পারে।”
২০২৫ সালের শেষের দিক থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে, যখন ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আতিথেয়তা করার সময় ইরানকে পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে আবারও আঘাত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। এর কয়েক দিন পরেই ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করার জন্য উৎসাহিত করে “সাহায্য আসছে” বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত মাসে ট্রাম্প ইরানকে হামলার কিনার থেকে কিছুটা সরে এসেছিলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রর চাপে ইরান ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ করতে রাজি হয়েছিল। এরপর গত ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানে প্রথম দফার আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হয়। তবে চলমান কূটনীতি সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হুমকি ও বৈরী বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে। ২০১৮ সালে তার প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প বহুপাক্ষিক পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেছিলেন, যা ইরানের অর্থনীতি থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কমিয়ে এনেছিল।
এই নতুন হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাতের আশঙ্কা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং এর মানবিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্বের নজর এখন আগামী ১০ দিনের দিকে, যেখানে চুক্তির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান আসবে নাকি সংঘাতের পথ প্রশস্ত হবে, তা স্পষ্ট হবে।





