বিধ্বস্ত বাইজেন্টাইন: শামের ভাগ্য কেন বদলালো?

মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক শাম অঞ্চল মুসলিমদের কাছে যুগ যুগ ধরে এক পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে এর ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছিল পতনোন্মুখ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুর্বলতা। দীর্ঘ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় সংঘাত সাম্রাজ্যটিকে এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছিল, যা নতুন এক শক্তির উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে শামকে ‘বরকতময় ভূমি’ বলা হয়েছে, যা অসংখ্য নবী-রাসুলের জন্ম ও কর্মস্থল ছিল। হযরত ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা (আ.)-এর মতো মহান ব্যক্তিরা এখানে দাওয়াত প্রচার করেছেন। মুসলিমদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদুল আকসা এই শামেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। দামেস্ক, জেরুসালেম, ও গাজার মতো শহরগুলো প্রাচীনকাল থেকেই ছিল জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। মুসলিম হৃদয়ে শামের জন্য এক বিশেষ টান ছিল এই গভীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে।
অন্যদিকে, সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য) বাহ্যিকভাবে বিশাল হলেও এর ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। সম্রাট হেরাক্লিয়াস সিংহাসনে বসার সময় পারস্যের সাসানীয়দের সঙ্গে ২৬ বছরের মরণপণ যুদ্ধ চলছিল, যাকে আধুনিক ঐতিহাসিকরা ‘প্রাচীনকালের বিশ্বযুদ্ধ’ বলেছেন। হেরাক্লিয়াস পারস্যকে পরাজিত করে শাম ও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করলেও, এই বিজয় ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাম্রাজ্যের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, জনসংখ্যা কমেছিল এবং অনেক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনী ছিল নিস্তেজ। সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ কোষাগারে ছিল না। আরব সীমান্তে তাদের ঘাসানিদ মিত্রদের আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেওয়ায় সীমান্ত রক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে স্থানীয় সিরীয় ও মিসরীয় খ্রিষ্টানরা বাইজেন্টাইনদের চেয়ে মুসলিমদের অধীনে থাকা ধর্মীয়ভাবে বেশি নিরাপদ মনে করতে শুরু করে। কনস্টান্টিনোপলের রাষ্ট্রীয় গির্জা এবং শামের স্থানীয় মনোফিজাইট খ্রিষ্টানদের মধ্যে তীব্র বিশ্বাসগত বিরোধ ছিল, যা সম্রাট হেরাক্লিয়াসের জবরদস্তিমূলক ধর্মীয় ঐক্যের চেষ্টায় আরও বেড়ে যায়। ঐতিহাসিক ফ্রেড ডোনারের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধর্মীয় ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই মুসলিমদের দ্রুত বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য শঙ্কিত ছিল ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে। তাদের দৃষ্টিতে, ইসলামের বার্তা যেভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তাতে খ্রিষ্টধর্ম বিস্মৃত অতীতে পরিণত হতে পারত। এ কারণেই শামের খ্রিষ্টশক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ছিল। রোমানরা ইসলামের উদীয়মান শক্তিকে নিজেদের জন্য চরম বিপদ মনে করে আরবদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে থাকে। এমনকি ফিরাজ যুদ্ধে রোমানরা প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যা শামের ভাগ্যবদলের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।





