আন্তর্জাতিক

খামেনি নিহত, ইরানের নেতৃত্বে ফের রুহানির ছায়া!

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটি এখন এক স্পর্শকাতর নেতৃত্বের পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির নাম আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে না থাকলেও, ইরানের বড় বড় রাজনৈতিক পালাবদলে হাসান রুহানির নাম বারবার ফিরে আসে। খামেনির আকস্মিক মৃত্যুর পর, সংবিধান অনুযায়ী দেশটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস (বিশেষজ্ঞদের পরিষদ) নতুন নেতা নির্বাচন না করা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি নিয়ে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ বর্তমানে দায়িত্বে আছে।

২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাসান রুহানি, যিনি আইন বিষয়ে ডক্টরেটধারী এবং একজন মুসলিম নেতা, তিনি কখনোই এই ব্যবস্থার বাইরের কেউ ছিলেন না। তিনি দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একজন অভিজ্ঞ সদস্য এবং সাবেক প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে পরিচিত। তিনি “সংস্কার” এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৩ সালে একজন বাস্তববাদী নেতা হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদে আসেন, যার লক্ষ্য ছিল কূটনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বস্তি নিয়ে আসা।

রুহানি তার রাজনৈতিক জীবনে মধ্যপন্থা (“এতেদাল”) বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছেন। তিনি ব্যবস্থার দুটি মূল স্তম্ভ—‘প্রজাতন্ত্র’ (বাস্তববাদ, সুশাসন, জবাবদিহিতা) এবং ‘ইসলামিক’ (আদর্শ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, বিপ্লবী পরিচয়)—এর মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA), যা ইরান এবং পি৫+১ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন)-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির ফলে ইরানের ওপর থেকে অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হিমায়িত সম্পদে তেহরানের প্রবেশাধিকার মেলে। রুহানি এই চুক্তিকে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করার এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর পথ হিসেবে দেখিয়েছিলেন।

তবে, ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেসিপিওএ থেকে সরে আসেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করেন, যা রুহানির প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক সুবিধা মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেয়। এটি ইরানের বাস্তববাদী ও সংস্কারপন্থীদের দুর্বল করে দেয়। এরপর, ২০২১ সালে রুহানির প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হয় এবং ইরানের রাজনীতিতে রক্ষণশীলদের আধিপত্য বাড়ায় তিনি ধীরে ধীরে প্রান্তিক অবস্থানে চলে যান। এমনকি, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস-এ পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকেও নিষিদ্ধ করে।

তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের অভিজাত মহলে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়ে যে ফিসফাস শুরু হয়েছে, তাতে রুহানির নাম ফের উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রুহানির নাম আবারও আলোচনায় আসাটা ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে তার কৌশলী আপস, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রিত সংশ্লিষ্টতার গুরুত্ব প্রমাণ করে। খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের এই সন্ধিক্ষণে ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে: তারা কি রুহানির মতো মধ্যপন্থী ও বাস্তববাদী নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করে বৈধতা বাড়াতে চায়, নাকি কঠোর নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক নীতিতে অটল থাকবে? এই সিদ্ধান্তই ইরানের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে, যা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button