আন্তর্জাতিক

ইরান হামলায় কাতার গ্যাস বন্ধ: ইউরোপে ৫০% দাম বৃদ্ধি, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শঙ্কা।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একের পর এক হামলার জেরে কাতার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি সংস্থা কাতারএনার্জি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সময়ে সৌদি আরবও ড্রোন হামলার পর তাদের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার রাস তানুরার কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এই ঘটনার পরপরই ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

কাতারএনার্জি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সামরিক হামলায় কাতারের রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্প এলাকার তাদের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদনকারী দেশটি গ্যাস ও সংশ্লিষ্ট পণ্য উৎপাদন স্থগিত করেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা দুটি ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। একটি ড্রোন মেসাইদে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জলের ট্যাঙ্ক এবং আরেকটি রাস লাফানে কাতারএনার্জির জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, সোমবার সকালে দুটি ড্রোন রাস তানুরা শোধনাগারে হামলার চেষ্টা চালায়। ড্রোনগুলো প্রতিরোধ করা হলেও একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে শোধনাগারটির সীমিত ক্ষতি হয়েছে, তবে কোনো হতাহতের খবর নেই। দৈনিক ৫,৫০,০০০ ব্যারেল তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন রাস তানুরা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার এবং এটি সৌদি আরবের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটলো যখন হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজগুলো জমা হচ্ছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং কাতারের গ্যাসের সিংহভাগ এই প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে। এই সামুদ্রিক অচলাবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দামও দ্রুত বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে।

কিং’স কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিদ্যার প্রভাষক রব গাইস্ট পিনফোল্ড আল জাজিরাকে জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান ঠিক কী করছে, তা তারা জানে। তার মতে, এই দেশগুলো যুদ্ধ চায় না, কারণ এটি তাদের যুদ্ধ নয়। ইরান ধারণা করছে যে, তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতি চাইবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। পিনফোল্ড আরও বলেন যে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো অন্তত মৌখিকভাবে শক্তি ও ঐক্যের প্রদর্শন করছে, তবে ইরানের সঙ্গে কীভাবে জড়িত হবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর মতবিরোধ রয়েছে।

কাতার ও সৌদি আরবের ওপর হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। জ্বালানি উৎপাদন বন্ধ এবং বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব পড়বে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই সংঘাতের বিস্তার এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে সম্ভাব্য আরও ব্যাঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল ও সাধারণ মানুষ শঙ্কিত। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কী মোড় নেবে, তা নিয়ে সকলেই গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button