অর্থনীতি

আমদানি-রপ্তানি হঠাৎ আকাশছোঁয়া! যা হচ্ছে জানেন?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের প্রভাবে আবারও অস্থির হয়ে উঠছে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্য। এ প্রেক্ষাপটে নতুন করে জাহাজ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মেইন লাইন অপারেটররা, যা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খরচে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপগামী কনটেইনার ভাড়া বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। আর মধ্যপ্রাচ্য রুটে সংযোগ প্রায় ভেঙে পড়েছে, যেখানে সীমিত আকারে চলাচলকারী জাহাজগুলো কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে। এর মধ্যেই পহেলা এপ্রিল থেকে আবারও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন নতুন দুশ্চিন্তায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের রপ্তানি খাত—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে।

শিপিং লাইন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপের বিভিন্ন বেস পোর্টে একটি ৪০ ফুট কন্টেইনার পরিবহনে ভাড়া ছিল এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ ডলার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চের শুরুতেই সেই ভাড়া বাড়িয়ে দেয় মেইন লাইন অপারেটররা। বর্তমানে কোম্পানি ভেদে একই কন্টেইনার পরিবহনে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৪০০ ডলার। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রগামী রুটে কৌশলগত কারণে সরাসরি ভাড়া না বাড়ানো হলেও কন্টেইনার প্রতি ৩০০ ডলার করে বাংকারিং চার্জ আরোপ করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই রুটে একটি কন্টেইনার পরিবহনে খরচ ছিল ২ হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ডলারের মধ্যে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে। ফেব্রুয়ারি মাসেও যেখানে এক কন্টেইনার পণ্য পাঠাতে খরচ হতো এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ ডলার, বর্তমানে সেই রুটে কার্যত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। বড় শিপিং লাইনগুলো ঝুঁকি এড়িয়ে চলায় সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে, আর সেগুলোতে ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এক হাজার ২০০ ডলারের ভাড়া এখন চার হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় ১ এপ্রিল থেকে আবারও ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে শিপিং কোম্পানিগুলো। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বগতি এবং যুদ্ধ ঝুঁকিকে কারণ দেখিয়ে তারা ভাড়া সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যদিও এখনো নির্দিষ্ট হারে ঘোষণা করা হয়নি, তবে মার্চের মতো এপ্রিলেও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। মেইন লাইন অপারেটররা ইতিমধ্যে বিষয়টি তাদের লোকাল এজেন্টদের মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. আরিফ জানান, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলেও তার প্রভাব পড়েছে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিয়ে লোকাল বাজারে জ্বালানি তেলে দাম বাড়তে না দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ঠিকই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানির দাম। একই সঙ্গে বাড়ছে সমুদ্রপথে জাহাজযোগে কন্টেইনার ও পণ্য পরিবহন খরচ। এই অস্থিরতা থেকে বাদ যাচ্ছে না বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও। মেইন লাইন অপারেটররা ইতিমধ্যে ১ এপ্রিল থেকে ভাড়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। তবে কী পরিমাণ ভাড়া বাড়বে সে ব্যাপারে এখনো কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুল আলম সুজন জানান, পরিস্থিতির প্রভাব শুধু কন্টেইনার পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই; বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়াও বেড়েছে অন্তত ২০ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক থাকলেও হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় রেড সি-ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ আগে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের হামলাসহ বিভিন্ন কারণে একাধিকবার হুথি বিদ্রোহীরা রেড সি বন্ধ করে দিয়েছে। হরমুজের পর রেড সিতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পুরো সমুদ্র বাণিজ্যে স্থবিরতা নামবে। এর ফলে জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হতে পারে, যাতে গড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হবে। ফলে সময় ও খরচ—দুইই বাড়বে উল্লেখযোগ্য হারে। মূলত এপ্রিলে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ভাড়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে মেইন লাইন অপারেটররা। বর্ধিত এই ভাড়া শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কিছুদিনের মধ্যেই এর থেকেও কয়েকগুণ বেশি ভাড়া বাড়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস. এম. আবু তৈয়ব জানান, হঠাৎ করে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কারণ এখন যেসব পণ্য জাহাজীকরণ হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশ অর্ডার নেওয়া হয়েছিল গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে—তখনকার ভাড়া কাঠামোর ভিত্তিতে। বর্তমানের এই বাড়তি জাহাজ ভাড়া ওই অর্ডারে ধরা হয়নি। বায়াররা বাড়তি টাকা কখনোই দেবে না। এই চাপ গার্মেন্ট মালিকদেরই নিতে হবে। কিন্তু সে সক্ষমতা অধিকাংশ গার্মেন্ট মালিকেরই নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক এই সংকট দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে ক্লোজ মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। শিপিং লাইনগুলো কতটা যৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়াচ্ছে এবং এর প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—সেসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button