অর্থনীতি

দৈনিক শত কোটি টাকা চাদা তোলা হচ্ছে দেশে

রাজধানীসহ সারা দেশে পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যোগসাজশে প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

এই চাঁদাবাজির বেশিরভাগই চালক ও মালিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা হয়। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকার করলে গাড়ি ভাঙচুর এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটে। টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, পার্কিংয়ের নামে, এমনকি পৌর টোলের সঙ্গেও জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে পরিবহন চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এই চাঁদা পরিশোধ করে যাচ্ছেন, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বর্তাচ্ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, যার ফলস্বরূপ সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। এতে সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের কল্যাণের নামে চাঁদা আদায় করা হলেও এর ৯০ ভাগই চালক-কন্ডাকটরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নেওয়া হয়। এই চাঁদার টাকা ব্যবহার করে একশ্রেণির প্রভাবশালী নেতা রাতারাতি ধনী হয়েছেন, কেউ কেউ সংসদ সদস্য-মন্ত্রীও হয়েছেন বলে জানা যায়। অথচ সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সম্প্রতি, সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম চাঁদাবাজিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। একইসাথে তিনি চাঁদা এবং চাঁদাবাজির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে বলেন যে, স্বেচ্ছায় দেওয়া চাঁদা সমর্থনযোগ্য, কিন্তু জোরপূর্বক আদায় করা চাঁদাবাজি নয়। পরবর্তীতে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এটিকে “অলিখিত বিধি” এবং “কল্যাণে ব্যয়” হিসেবে মন্তব্য করলে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন সিটি বাস থেকে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা, দূরপাল্লার বাস থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা, সিএনজি অটোরিকশা (ঢাকা ও চট্টগ্রাম) থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা, ব্যাটারিচালিত রিকশা (ঢাকা ও সারা দেশ) থেকে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা, এবং ট্রাক থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এছাড়াও টেম্পো, লেগুনাসহ অন্যান্য পরিবহন থেকে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা আদায় হয়, যা মোট দৈনিক ১০০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটোই বিদ্যমান এবং এতে পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়িত। তিনি ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ও ডিজিটাল মামলা পদ্ধতি চালু করার মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর জোর দেন। একইসাথে বর্তমান মন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু জানান, তাদের ফেডারেশনের নামে সরাসরি চাঁদা আদায় করা না হলেও মালিক সমিতি ও বিভিন্ন খাতে পুলিশসহ অন্যদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম জানান, তারা টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু টাকা আদায় করেন, যা ব্যবস্থাপনা খরচ। তবে তিনিও স্বীকার করেন যে এর বাইরেও সড়কে পদে পদে পরিবহনগুলোকে জোরপূর্বক চাঁদা দিতে হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে তারা কঠোর অবস্থানে থাকলেও টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে শোনা যায়।

পরিবহন খাতে এই লাগামহীন চাঁদাবাজি সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। সরকারের সদিচ্ছা এবং কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জনগণ তাকিয়ে আছে, কবে এই চাঁদাবাজির চক্র ভেঙে তাদের ওপর থেকে নিত্যপণ্যের দামের বোঝা লাঘব হবে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button