অর্থনীতি

ট্রাম্পের জরুরি শুল্ক বাতিল: আমেরিকার বাজেট নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি ভিত্তিতে আরোপ করা শুল্ক বাতিল করে রায় দিয়েছে। এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য সরকারি কার্যক্রম বন্ধ (গভর্নমেন্ট শাটডাউন) হওয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

কী ঘটেছে:
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইন জানিয়েছেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন বাজেটের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে। কারণ, বাজেট প্রণয়নের সময় এই শুল্ক থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের একটি বড় অংশ ধরা হয়েছিল। পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের অনুমান অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই শুল্কগুলো চালু হওয়ার পর থেকে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাজস্ব এনেছিল এবং আগামী দশকে এটি ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয়ের পূর্বাভাস ছিল।

প্রভাব ও শঙ্কা:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে বাজেটের বিশাল একটি রাজস্ব প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সরকারি ব্যয় মেটাতে প্রশাসনকে নতুন করে ভাবতে হবে। ব্রুস ফেইন সতর্ক করে বলেছেন, “ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্তের অর্থ হলো, আরেকটি সরকারি শাটডাউন এড়াতে প্রশাসনকে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, এই রায় স্পষ্টতই প্রেসিডেন্ট যা চান তাই করতে পারেন এমন ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছে।

তবে, প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস জোর দিয়েছেন যে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত IEEPA (International Emergency Economic Powers Act) আইনের ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল, যার মাধ্যমে ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পেয়েছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে, ট্রাম্পের অন্যান্য নির্বাহী আদেশও বাতিল হবে। মাইকেল পিয়ার্স, অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ, আল-জাজিরাকে বলেছেন যে ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই রায় গত বছর আরোপিত শুল্ক বাতিল করার ক্ষেত্রে “অসংজ্ঞায়িত” ছিল।

সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব:
বাজেট অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বা অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচির মতো খাতে সরকারি বরাদ্দ প্রভাবিত হতে পারে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সরকারি শাটডাউন হলে হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী বেতনহীন হয়ে পড়েন এবং জনসেবা ব্যাহত হয়। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্ট এখনও এই শুল্কের অধীনে ইতিমধ্যে পরিশোধিত ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ফেরত দিতে হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো রায় দেয়নি। এর ফলে একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভবিষ্যৎ:
জার্মানির বেশ কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠী সতর্ক করে জানিয়েছে, শুল্ক বন্ধের আদালতের সিদ্ধান্ত স্বল্পস্থায়ী হতে পারে। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন VDMA বলেছে, ট্রাম্প IEEPA ছাড়া অন্য কোনো আইনের অধীনে ইইউ আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপ করতে পারেন। জার্মান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মতে, ট্রাম্পের কাছে একই ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োগ করার জন্য অন্যান্য বিকল্পও রয়েছে। বিজিএ পাইকারি ও বৈদেশিক বাণিজ্য সমিতির প্রেসিডেন্ট ডির্ক জান্দুরা বলেন, এই সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প বাণিজ্যনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবেন বলে মনে হয় না। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে গণতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতিগুলোর একটি “ট্রেড ন্যাটো” গঠন করা উচিত।

এই রায়ের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যেমন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় এবং শুল্ক ফেরতের বিষয়ে আইনি লড়াইয়ের ফলাফল কী হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর। এই পরিস্থিতি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মনে আগামী দিনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button