মার্কিন তদন্ত: ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কি অনিশ্চিত?

ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি আপাতত কয়েক মাস স্থগিত রাখতে পারে নয়াদিল্লি। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এক তদন্তের কারণেই এমন সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে ভারত। ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য অংশীদারদের তথাকথিত ‘অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদনের’ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। চারটি ভারতীয় সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। মার্চ মাসেই পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আগে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের প্রত্যাশা ছিল ভারতের।
এই সিদ্ধান্তে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছিলেন। এর বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে রাশিয়ান তেল আমদানি বন্ধ করা, আমেরিকান পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো এবং প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য কেনার অঙ্গীকার চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন সেই সময়সূচি কয়েক মাস পিছিয়ে যেতে পারে। যদিও ভারতের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, দুই পক্ষই পারস্পরিক লাভজনক একটি বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্যে যোগাযোগ বজায় রেখেছে, তবে চুক্তির নির্দিষ্ট সময়সূচি সম্পর্কে তিনি কিছু জানাননি। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তাও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ভারতের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালত ট্রাম্প আরোপিত শুল্ক বাতিল করে দেওয়ার পর আলোচনা গতি হারায়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়নি, বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। ভারত রাশিয়ার তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ না করলেও কিছুটা কমিয়েছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা নয়াদিল্লিকে আবারও আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কিছুটা কমানো যায়।
অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যেসব দেশের ওপর এ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে, তার মধ্যে ভারতও রয়েছে। দিল্লি মনে করছে, নতুন এই তদন্ত মূলত আদালতের রায়ের পর দেশগুলোকে চুক্তি স্বাক্ষরে চাপ দেওয়ার একটি কৌশল। এতে পুরো প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হয়েছে।
১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এই তদন্ত শুরু হয়েছে। ভারতের পরিকল্পনা হলো, তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরবে অথবা রায়ের জন্য অপেক্ষা করবে। প্রয়োজনে তারা বিষয়টি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) নিয়ে যেতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেছেন, সেকশন ৩০১ ছাড়াও ট্রাম্পের কাছে শুল্কারোপের আরও বিভিন্ন উপায় রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, তারা সে শর্তগুলো মানবে। তার মতে, ভারতও তা করবে কারণ এটি শুধু প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয় নয়, বরং উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প ২৪ জুলাই পর্যন্ত সব দেশের আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছেন। ভারতের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী তাদের পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল। এখন নয়াদিল্লি জানতে চাইছে, ওয়াশিংটন আবার সে হারেই ফিরবে কি না, নাকি অন্য কোনো শুল্কহার প্রয়োগ করবে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এশিয়া ডিকোডেডের বিশ্লেষক প্রিয়াংকা কিশোর মনে করেন, ভারতের জন্য বাণিজ্য আলোচনা ধীরস্থির করা যুক্তিযুক্ত। তার মতে, এখন যদি শুল্ক ১০ শতাংশ থাকে এবং তদন্ত চলতে থাকে, তাহলে আগে থেকে চুক্তি সই করার চেয়ে অপেক্ষা করে দেখা ভালো।
এই পরিস্থিতিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। দুই দেশই একে অপরের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে, যা আগামী মাসগুলোতে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।





