অর্থনীতি

প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমালো চীন, কীসের ইঙ্গিত?

বেইজিংয়ে চলমান ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (NPC)-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে চীন ২০২৬ সালের জন্য মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। যা সাম্প্রতিক “প্রায় ৫ শতাংশ” লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।

এই নতুন লক্ষ্যমাত্রা চীনের অর্থনৈতিক মন্দার ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে দেশটির আবাসন খাতের পতন, যা একসময় মোট দেশজ উৎপাদনের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল, এই মন্দার অন্যতম কারণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লক্ষ্যমাত্রা চীনের আরও বাস্তববাদী এবং রক্ষণশীল প্রত্যাশার প্রতিফলন। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের চীনা অর্থনীতিবিদ তিয়ানচেন জু রয়টার্সকে বলেন, এটি ‘সংখ্যা-কেন্দ্রিক’ মানসিকতা থেকে ‘গুণগত মান-কেন্দ্রিক’ মানসিকতার দিকে একটি বড় পরিবর্তন।

তিনি আরও বলেন, বেইজিং এখন উচ্চ প্রবৃদ্ধিকে সবসময় ইতিবাচকভাবে দেখছে না, কারণ এটি স্থানীয় কর্মকর্তাদের বাড়াবাড়ি প্রকল্প এবং ডেটা ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অতিরঞ্জিত করতে উৎসাহিত করতে পারে। বরং সরকার এখন পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি এবং জনসেবায় আরও বেশি সুযোগের মতো বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফলের দিকে মনোনিবেশ করছে। এছাড়া, চীন প্রতিরক্ষা খাতে ৭ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হার হলেও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় বেশ বেশি।

দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দার মুখে, চীন এখন উৎপাদন ও রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ভোগ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-চালিত অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করে শিল্প খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনেরও লক্ষ্য রয়েছে তাদের। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি চাপ, দুর্বল ভোক্তা আস্থা, উচ্চ বেকারত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব। সরকার ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস, বায়োমেডিসিন এবং লো-অ্যালটিটিউড ইকোনমির (ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার) মতো উন্নত শিল্পগুলোকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। এছাড়াও, অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা (ইনভলুশন) এবং জনসংখ্যা হ্রাস, বয়স্ক জনগোষ্ঠী, কম জন্মহার ও এক-সন্তান নীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের মতো সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায়ও মনোযোগ দিচ্ছে চীন। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে স্থানান্তরের মাধ্যমে সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস এবং চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স (CPPCC) মিলে “টু সেশনস” নামে পরিচিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে চীনের আগামী পাঁচ বছরের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) ঘোষণা করা হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপি প্রতি ব্যক্তি আয় দ্বিগুণ করে একটি “মধ্যম উন্নত” অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে চীনের। এই লক্ষ্যমাত্রা পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button