আন্তর্জাতিক

হরমুজে আগুন লাগলে বিশ্ব কাঁপবে, বাংলাদেশে কী হবে?

ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুদ্ধের দামামা বাজছে। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক বিশাল ঝড় তুলবে। প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার উপর এর প্রভাব পড়বে সুদূরপ্রসারী।

হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক পথ নয়, আধুনিক বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, কূটনীতি এবং সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা, কূটনৈতিক চাল এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা—সবই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এখানকার সামান্যতম অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

ইরান এই প্রণালীকে নিজেদের কৌশলগত শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা আধুনিক নৌ-অস্ত্র ও কৌশল দিয়ে এখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-বাহিনী ও মিত্র দেশগুলোর উপস্থিতিও প্রণালী নিয়ন্ত্রণে একটি বড় ফ্যাক্টর। এই দুই শক্তির টানাপোড়েন হরমুজকে পরিণত করেছে এক অনিশ্চিত ‘চোকপয়েন্টে’।

হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার—প্রত্যেক দেশই তাদের জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় সক্রিয় হয়ে উঠবে। যুদ্ধের রূপ বহুমাত্রিক হতে পারে—স্থল, সমুদ্র, আকাশ, সাইবার এবং অর্থনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই।

সুয়েজ সংকটের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির তুলনা করা হলেও, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পারমাণবিক শক্তির উপস্থিতি, জটিল জোট রাজনীতি এবং আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনীতি—এসব কারণে হরমুজকেন্দ্রিক সংঘাতের পরিণতি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক।

এই বৈশ্বিক অস্থিরতা থেকে বাংলাদেশও বিচ্ছিন্ন নয়। হরমুজে কোনো সংকট দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন খরচ এবং বিদ্যুতের উপর প্রভাব ফেলবে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমবে এবং নাগরিক জীবনে ‘লোডশেডিং’ বাড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করবে। পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে বাজারে চাল, ডাল, তেল, নির্মাণসামগ্রী—সবকিছুর দাম বাড়বে। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা কঠিন হবে এবং নিম্নবিত্তের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে এবং টাকার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।

বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও এই ‘জ্বালানিনির্ভর ঝুঁকির বলয়’-এর শিকার হবে। ভারতের মতো দেশ হয়তো কিছুটা সামাল দিতে পারবে, কিন্তু পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো গভীর সংকটে পড়তে পারে।

রাজনৈতিকভাবে, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে জনমনে অসন্তোষ বাড়বে, সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশকে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অবস্থান—এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনে ঝুঁকি বাড়লে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার—এগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের প্রতিরোধের প্রধান উপায়। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারে।

হরমুজ প্রণালির জলরাশি আমাদের থেকে হাজার মাইল দূরে হলেও, এর ঢেউ বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজে প্রতিফলিত হবে। তাই এ সংকটকে শুধু একটি দূরের যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি আমাদের নীতিনির্ধারণ, প্রস্তুতি এবং দূরদর্শিতার এক কঠিন পরীক্ষা।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button