জাতীয়

স্থগিত স্থানীয় নির্বাচন: দেশে কি প্রশাসক যুগ শুরু? রহস্যের জট খুলছে!

দেশের সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের পর স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচন, যেমন—উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই নির্বাচন নিয়ে আপাতত আগ্রহ কম—এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত সর্বত্র এটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। বর্তমানে জোড়াতালি দিয়ে পরিষদের কাজ চালানো হচ্ছে। নির্বাচন আগে না পরে হবে, তা নিয়ে সাধারণ জনগণ এবং সরকার উভয়ই দ্বিধায় রয়েছে। সম্প্রতি দেশের সব সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই—এ বিষয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। স্থানীয় সরকার আইন, বিশেষ করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে সংসদে সিদ্ধান্ত হলে উপজেলা নির্বাচন আয়োজনের পথ আরও সহজ হবে। সরকার মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক শক্তির বাস্তব অবস্থা যাচাই করতে চায় উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে। এতে সবুজ সংকেত মিললে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হতে পারে।

অন্যদিকে, পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুম এড়িয়ে পৌরসভা নির্বাচন করার চিন্তা রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্ট পৌরসভার মেয়াদোত্তীর্ণ, মেয়াদকালীন ও মামলা সংক্রান্ত পৌরসভার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকার নির্দেশ দিলে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ জানানো হবে। তবে, আপাতত পৌরসভায় কোনো প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না, বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, এখন পর্যন্ত উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সরকার এবং মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে যেগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং যেগুলোতে ইউএনও ও এসিল্যান্ড প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তারাই চালিয়ে যাবেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিতরাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিধিত্ব করবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সচল রাখতে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হলে তৃণমূলের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে। সর্বশেষ ২০২২ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আইন অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকায় চলতি বছরের মধ্যেই অনেক ইউপি নির্বাচন শেষ করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে তৃণমূলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের জবাবদিহিতা থাকে, যা জনগণের প্রত্যাশিত সেবা প্রাপ্তির সুযোগ বাড়ায়। তিনি আরও জানান, উপজেলা, পৌরসভা বা স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন নতুন করে কোনো তাগিদপত্র পায়নি।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রাণ হলো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। প্রশাসক দিয়ে কিছু দিন কাজ চালানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি কার্যকর সমাধান নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সক্রিয় না থাকলে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনসেবা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button