জাতীয়

ইভিএম প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকা লুট! কাদের পকেটে গেল জনগণের টাকা?

প্রযুক্তি আর উন্নয়নের নামে নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্পের অধীনে প্রায় দেড় লাখ মেশিন কেনার জন্য প্রায় তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকারি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের প্রতিবেদন বলছে, বাজারমূল্যের প্রায় ১০ গুণ বেশি দামে এসব মেশিন কেনা হয়েছে, যা রাষ্ট্রের প্রায় তিন হাজার ১৭২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছে।

এই প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করে, উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি পদ্ধতিতে এই যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। সেনাবাহিনীর অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলেও, যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়েছে বিদেশ থেকে, যা স্বচ্ছতার নীতির পরিপন্থী।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন সচিব এই প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে এটি একটি “প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধ”।

প্রকল্পের আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হলো, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা বেশিরভাগ ইভিএম মেশিনই এখন অচল। মাত্র কয়েক হাজার মেশিন ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে, যা কার্যত “ডিজিটাল আবর্জনা”তে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে প্রতি তিনটি মেশিনের একটি ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেছে, যা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের প্রমাণ দেয়।

১০ বছরের ওয়ারেন্টির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও মাত্র এক বছরের ওয়ারেন্টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী। এছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, যা একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত এই প্রকল্পের ব্যর্থতার একটি নীরব স্বীকৃতি।

এই বিপুল অঙ্কের অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে কঠোর, নিরপেক্ষ ও সর্বাত্মক তদন্ত প্রয়োজন। ক্ষমতার প্রভাব বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের এই লুটপাটের মুখোশ উন্মোচন ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button