জাতীয়

ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড দুই পরিবার: চট্টগ্রামে একজনের মৃত্যু, দগ্ধ ১৪ জন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

রবিবার দিবাগত ভোর রাতে চট্টগ্রামের হালিশহর ও রাজধানী ঢাকার হাজারীবাগে গ্যাস বিস্ফোরণের দুটি পৃথক ঘটনায় মোট ১৪ জন গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় উভয় পরিবারের সদস্যরা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রান্নাঘরে গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণগুলো ঘটেছে।

**চট্টগ্রামের হালিশহরে বিস্ফোরণ: এক মৃত্যু, ৯ জন দগ্ধ**
রবিবার ভোর রাতে চট্টগ্রামের হালিশহরের এসি মসজিদের পাশে ‘হালিমা মঞ্জিল’ নামের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে। রান্নাঘরের জমে থাকা গ্যাস থেকে সৃষ্ট এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় পরিবারগুলো। এতে শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), উম্মে আইমন (৯), আয়েশা আক্তার (৪), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০) সহ মোট ৯ জন দগ্ধ হন। এই ৯ জনের মধ্যে একজন ঢাকা নেওয়ার পথে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। বাকিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত এবং প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, দগ্ধদের মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালি শতভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া, মো. শিপনের ৮০ শতাংশ এবং মো. সুমন ও মো. শাওনের ৪৫ শতাংশ পুড়েছে। তিন শিশু মো. আনাস, উম্মে আইমন ও আয়েশা আক্তারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের ১০ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ১৫ শতাংশের বেশি পুড়ে গেলে অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে বিবেচিত হয়। বেশিরভাগেরই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আগ্রাবাদ স্টেশনের কর্মকর্তা খান খলিলুর রহমান জানান, চুলা থেকে গ্যাস লিকেজ হওয়ায় রান্নাঘরে গ্যাস জমে ছিল। এর থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে পুরো ঘরে আগুন ধরে যায়। ফায়ার সার্ভিসের চারটি গাড়ি প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। জানা গেছে, দুই ভাই পরিবার নিয়ে ঐ বাসায় থাকতেন এবং কুমিল্লার বুড়িচং থেকে এক ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার প্রয়োজনে এসে তারাও দগ্ধ হয়েছেন। হালিশহর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাজেদুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণে তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং পুরো ভবনের ১০-১২টি ফ্ল্যাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

**রাজধানীতে বিস্ফোরণ: শিশুসহ ৪ জন দগ্ধ**
একই রাতে রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন রায়েরবাজার এলাকার জাহানারা ভিলার ছয় তলার নিচতলায় ভাড়া বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একই পরিবারের চার জন দগ্ধ হন। দগ্ধরা হলেন, শেখ নোমান (৩৫), পিংকি আক্তার (৩২), তাদের ছেলে রোহান (৩) ও শেখ নোমানের শ্যালক অপু (২৩)। গত রবিবার রাত পৌনে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দগ্ধ অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, শেখ নোমানের শরীর ৭০ শতাংশ, তার স্ত্রী পিংকি আক্তারের ৭৫ শতাংশ, ছেলে রোহানের ৩৫ শতাংশ এবং শ্যালক অপুর ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের সবাইকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে এবং প্রত্যেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। প্রতিবেশী মো. মামুন জানান, এটি একটি ভাড়া বাসা ছিল যেখানে নোমান তার পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।

এই দুটি ভয়াবহ ঘটনায় দগ্ধদের সবাই বর্তমানে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তাদের দীর্ঘ ও কঠিন আরোগ্য লাভের পথে পরিবারগুলো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন। গ্যাসের সামান্য অসতর্কতা যে কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং একটি পরিবারকে মুহূর্তেই কতটা লন্ডভন্ড করে দিতে পারে, এই ঘটনাগুলো আবারও তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button