মৌলবাদ থেকে উগ্রবাদ: ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের চাঞ্চল্যকর রূপান্তর!

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক বয়ান দেশটির পথ ও রাজনীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু জনমত বা জনসমর্থনের তোয়াক্কা না করেই তৈরি হওয়া এসব বয়ান, বিশেষ করে ইসলামবিদ্বেষী ও অপরিণামদর্শী বয়ান, গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক বিভাজনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে তথাকথিত ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ যে ধারণা তৈরি করা হয়েছিল, তা অনেক সময় ‘বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রের ফুটবল ম্যাচ’-এর মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে – যেখানে একইসঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান হওয়া অসম্ভব বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
দেশ স্বাধীনের পরপরই আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি পরিকল্পিতভাবে এই বিভাজনের ধারণা চাপিয়ে দেয়। পরবর্তীতে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে গড়ে ওঠা উদ্যোক্তা ও বিজনেস ক্লাস, যারা আদর্শগতভাবে সেক্যুলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল, তারা একটি এলিট অ্যালায়েন্সের প্রধান পোষক হয়ে ওঠে। তাদের অর্থায়ন ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রভাবের ফলে গণমাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ে এবং ‘পুঁজি লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী’ সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে।
অতীতে, ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দিয়ে ইসলামি মূল্যবোধনির্ভর রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হতো। কিন্তু ২০০১ সালের ‘টুইন টাওয়ারে’ হামলার পর এই বয়ানের পরিবর্তন ঘটে। ‘মৌলবাদ’ থেকে ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘Extremism’-এর রাজনীতি শুরু হয়। Preventing Violent Extremism (PVE) প্রকল্পের আওতায় সংবাদমাধ্যম, সিভিল সোসাইটি ও এনজিওগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে দেশজুড়ে জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমানদের জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করার অভিযোগ ওঠে, যেখানে মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর ফলে বিনা ভোটে ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সত্ত্বেও দলটি ১৫ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকে।
স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলমানরা নীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কোনো ক্ষেত্রে ন্যূনতম ভূমিকা পালন করতে পারেনি – এমন অভিযোগও উঠেছে। ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর জনগণ যখন ইনসাফ, সাম্য ও মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি তৈরির প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, তখন নতুন করে ‘উগ্রবাদী’ অভিধায় মজলুম জনতাকে ভূষিত করার অভিযোগ ওঠে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এই প্রকল্প দ্রুত ছড়ানো হয়, যা জনগণের সুশাসন ও ইনসাফের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে দেয়।
ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে সংঘাত ও বিদ্বেষের পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশপন্থি রাজনীতিকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত করা, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের মাঠে নামানো, সুশাসন, ইনসাফ ও মর্যাদার বয়ান নির্মাণ এবং তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।





