আন্তর্জাতিক

ইরানে প্রতিবাদে হাজারো প্রাণহানি: সরকারের ‘সন্ত্রাসী’ অভিযোগের জেরে বাড়ছে মানুষের দুশ্চিন্তা

ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় সরকার আবারও ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছে। তেহরান দাবি করেছে যে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রায় ৩,১১৭ জন ‘সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী অভিযানের শিকার’, যার মধ্যে ২০০ জন নিরাপত্তা কর্মীও রয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে এবং এর তীব্র সমালোচনা করছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার জানান, সরকার নিহতদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে এবং যারা এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে, নিহতদের মধ্যে ৬৯০ জন ‘সন্ত্রাসী’ ছিল, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল থেকে অর্থ ও অস্ত্র পেত। আরাঘচির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, বিক্ষোভে ৩২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং ইরানের মানুষ ‘নরকের জীবন’ কাটাচ্ছে।

তবে মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ইরানের সরকারি তথ্যের সঙ্গে তীব্রভাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ইরানের মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মাই সাতো বলেছেন, ২০,০০০ এরও বেশি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু সরকারি বিধিনিষেধ এবং ইন্টারনেট ফিল্টারিংয়ের কারণে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রেরভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা বিক্ষোভে ৭,০০০ এর বেশি মানুষের মৃত্যুর নথিভুক্ত করেছে এবং আরও প্রায় ১২,০০০ ঘটনার তদন্ত করছে।

জাতিসংঘের ৩০ জন বিশেষ প্রতিবেদক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ শুক্রবার এক যৌথ বিবৃতিতে ইরান সরকারের কাছে আটক, জোরপূর্বক গুম বা নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার মানুষের পরিণতি প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল মৃত্যুদণ্ড ও ফাঁসি স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, “ইরানি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংস দমন-পীড়নের প্রকৃত মাত্রা এই মুহূর্তে নির্ধারণ করা অসম্ভব। সরকারি পরিসংখ্যান এবং তৃণমূলের অনুমানের মধ্যে এই বৈষম্য স্বজনহারা পরিবারগুলোর যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং মানবাধিকার ও জবাবদিহিতার প্রতি গভীর অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে।” বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, নিহত বা আটককৃতদের বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে শিশু, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, এমনকি আফগান নাগরিকরাও রয়েছেন। এছাড়াও আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও মানবাধিকার কর্মীরাও আছেন।

এই ব্যাপক প্রাণহানি এবং এর কারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যেমন তীব্র বিতর্ক চলছে, তেমনি ইরানের ভেতরে স্বজনহারা পরিবারগুলোর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘ঐক্য ও সহমর্মিতা’র আহ্বান জানানো হলেও, বহু পরিবার গত সপ্তাহে তাদের প্রিয়জন হারানোর ৪০ দিন পূর্তিতে নিজেদের মতো করে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে স্মরণসভা করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পরিবারের সদস্যরা ও বিশাল জনসমাগম গর্বের সঙ্গে নিহতদের ছবি হাতে নিয়ে তাদের ছোট হয়ে আসা জীবনকে উদযাপন করছেন। অনেকেই হাততালি, ঐতিহ্যবাহী ঢোল ও করতাল বাজিয়ে এবং এমনকি নাচের মাধ্যমে প্রতীকী প্রতিরোধ ও অবাধ্যতা প্রদর্শন করেছেন, যা রাষ্ট্রের ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গোলিস্তান প্রদেশের গোরগান শহরে নিহত ৩৩ বছর বয়সী আবোলফজল মিরআইজের বাবা একটি স্মরণসভায় উপস্থিত জনতাকে বলেন, “আমার ছেলে দাঙ্গাবাজ, আত্মসাৎকারী বা অভিজাতের সন্তান ছিল না। সে ছিল একজন কৃষকের সন্তান।” এই ঘটনাগুলো ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়াচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও বিচার দাবিতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা কবে শেষ হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button