আন্তর্জাতিক

অর্থনৈতিক দুর্বলতা? চীনের সামরিক বাজেট ৭% বৃদ্ধি, চিন্তায় প্রতিবেশীরা

সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০২৬ সালের জন্য চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট ৭ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দেশটির পার্লামেন্টের বার্ষিক অধিবেশন উদ্বোধনের সময় এই ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং।

যদিও গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন বৃদ্ধি, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের তুলনায় এই বৃদ্ধি এখনও উল্লেখযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেন, দেশের যুদ্ধ প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা হবে এবং উন্নত সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। তাঁর কর্মপরিকল্পনা প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপগুলো চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন স্বার্থ রক্ষার কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াবে।

চীনের সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীকে পূর্ণাঙ্গভাবে আধুনিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডের দায়িত্বে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে চীন দীর্ঘদিনের নীতি অনুসরণ করছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেমস চার বলেন, চীনের সামরিক বাজেট সাধারণত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয়।

এদিকে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানও জোরদার করেছে বেইজিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক শীর্ষ জেনারেলের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জাং ইয়োশিয়াকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে এবং গত বছর জ্যেষ্ঠ জেনারেল হে ওয়িডংকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাইওয়ানভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইয়েন টি সাং বলেন, দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযান দেখাচ্ছে যে বেইজিং সামরিক ব্যয়ের ওপর আরও কঠোর নজরদারি রাখতে চায়। চীন সরকার আবারও জোর দিয়ে বলেছে যে দেশটির শাসক দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ‘পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব’ বজায় রাখবে।

তবে চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তাইওয়ান ও জাপান। তাইপের মূলভূমি বিষয়ক কাউন্সিলের মুখপাত্র লিয়াং ইয়েনচেহ বলেন, দুর্বল অর্থনীতি ও কম ভোক্তা ব্যয়ের মধ্যেও চীন সামরিক খাতে বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করছে, যা তাইওয়ানের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেন, চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনের সামরিক ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়ার মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশই ছিল চীনের, যেখানে ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই হার ছিল গড়ে ৩৭ শতাংশ।

বর্তমানে চীনের ঘোষিত প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১ দশমিক ৯১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলার)। গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট আইনে স্বাক্ষর করেন। চীনের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, তেমনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতা ভারসাম্যের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দুর্বল অর্থনীতির মধ্যেও সামরিক খাতে বিপুল ব্যয়, তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর উৎকণ্ঠা আরও বাড়াচ্ছে।

এই বিভাগের আরও

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button