খামেনির মৃত্যু: ইরানের যুদ্ধনীতিতে বড় পরিবর্তন?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। এই হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত ইরানের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর খবর ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরপরই দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কঠোর প্রতিশোধের অঙ্গীকার করে। তারা “ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আক্রমণাত্মক অভিযান” চালানোর ঘোষণা দেয়, যা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান আমির হাতামিও দেশের প্রতিরক্ষা অব্যাহত রাখার শপথ করেছেন এবং দাবি করেছেন যে তাদের যুদ্ধবিমান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এর আগেও ইরান ইসরায়েল ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তেহরান ইসরায়েল এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, যেখানে মার্কিন সেনারা মোতায়েন ছিল। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করা হয়েছিল।
তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, গত জুন মাসের যুদ্ধের পর থেকেই ইরান তার সামরিক কৌশল আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছে, যা মূলত ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ইরানের সামরিক শক্তিকে প্রায়শই জটিল ও অস্বচ্ছ বলে বর্ণনা করা হয়। দেশটিতে সমান্তরাল সেনাবাহিনী, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্তরযুক্ত কমান্ড কাঠামো রয়েছে, যার সবই সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনে কাজ করে। এই সমান্তরাল সেনাবাহিনীর মধ্যে রয়েছে ‘আর্তেশ’ – যা ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা, আকাশসীমা ও প্রচলিত যুদ্ধের জন্য দায়বদ্ধ; এবং আইআরজিসি – যার ভূমিকা শুধু প্রতিরক্ষা ছাড়িয়ে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো রক্ষা করাও বটে। আইআরজিসি ইরানের আকাশসীমা এবং ড্রোন অস্ত্রাগারও নিয়ন্ত্রণ করে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন জটিল সামরিক কাঠামো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের হুমকি, যেমন অভ্যুত্থান থেকে দেশকে রক্ষা করার একটি সুচিন্তিত কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান শাহেদ ড্রোন (ইরানি মনুষ্যবিহীন যুদ্ধবিমান) এবং উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করলেও, কিছু সামরিক স্থাপনা এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। এমনকি প্রতিহত হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ কিছু বেসামরিক এলাকায়ও পড়েছে। শনিবার ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত (যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) লক্ষ্য করে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যার ফলে দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ এবং বুর্জ আল আরব ল্যান্ডমার্কগুলিতেও আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে। আবুধাবি বিমানবন্দরে “ঘটনার” ফলে অন্তত একজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন। দুবাই বিমানবন্দর এবং কুয়েতের বিমানবন্দরও আক্রান্ত হয়েছে। রবিবার ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত নয়জন নিহত ও ২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জন ফিলিপস আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশল হলো তীব্র ইসরায়েল-মার্কিন চাপ মোকাবিলা করে নিজেদের মূল সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রক্সিদের মাধ্যমে ‘ক্যালিব্রেটেড অ্যাসিমেট্রিক এসকালেশন’-এর মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। তিনি জানান, ইরানের এই কৌশলে “অ্যাসিমেট্রিক এন্ডুরেন্স” একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার অর্থ হলো “ক্ষেপণাস্ত্র শহর” গুলোকে সুরক্ষিত করা, কমান্ড কাঠামোকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সব হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা না করে প্রাথমিক ক্ষতি মেনে নিয়ে দ্বিতীয়বার পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা বজায় রাখা। পাশাপাশি, “আঞ্চলিক স্যাচুরেশন” এবং প্রক্সি যুদ্ধও কৌশলের অংশ, যেখানে ইরান “বৃহৎ সংখ্যক ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও লয়টারিং যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে, হিজবুল্লাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অবশিষ্ট সহযোগী মিলিশিয়াদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে আঞ্চলিকভাবে ক্ষতি আরোপ করছে।” সোমবার সকালে হিজবুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে।
ফিলিপস আরও যোগ করেছেন যে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে, যা যুদ্ধের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে পশ্চিমা ও উপসাগরীয় সরকারগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নড়বড়ে করে দিতে পারে। যদিও ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালীটি বন্ধ করেনি, তবে রবিবার শিপিং ডেটা থেকে দেখা গেছে যে অন্তত ১৫০টি ট্যাংকার, যার মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ রয়েছে, প্রণালীর বাইরে খোলা উপসাগরীয় জলরাশির নোঙর করেছে।
ফিলিপস বলেন, গত বছরের জুন মাসের যুদ্ধের পর তেহরান তার সামরিক নীতি মূলত প্রতিরক্ষামূলক সংযম থেকে সরিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট আক্রমণাত্মক অ্যাসিমেট্রিক অবস্থানে নিয়ে গেছে। জুন ২০২৫ সালের যুদ্ধ ছিল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি বড় ধরনের সরাসরি, উচ্চ-তীব্রতার সংঘাত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। তবে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ক্ষতির কারণে ইরানের ক্ষমতা কিছুটা সীমিত হয়েছে। তারপরও ইরান বর্তমানে ঝুঁকি নিতে এবং সংঘাত বাড়াতে আরও ইচ্ছুক।
তবে, সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তিত কৌশল কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা বলা এখনো কঠিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেন, “ইরানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে, তবে বর্তমানে মাটিতে কোনো সেনা নেই, এবং এটি একটি আকাশ যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তেহরান তাদের বিমান ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বাড়িয়েছে, কিন্তু তারা টিকে থাকতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।”
এই সংঘাত কতদিন চলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফিলিপস বলেন, সামরিক দিক থেকে, ইরান “বছরের পর বছর ধরে অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, প্রক্সি এবং সাইবার অপারেশন” চালিয়ে যেতে পারে, কারণ এই ব্যবস্থাগুলি তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুরক্ষিত সুবিধাগুলি থেকে উৎপাদন ও মোতায়েন করা যেতে পারে। তবে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে, দীর্ঘায়িত উচ্চ-তীব্রতার সংঘাত, যা বারবার বৃহৎ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আমন্ত্রণ জানায়, গুরুতর অর্থনৈতিক সংকোচন, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং শাসনের বৈধতার আরও ক্ষয় ঘটাতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পাল্টা জবাবের বিষয়ে বারবার সতর্ক করেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন যে পাল্টা জবাবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র “এমন শক্তি দিয়ে ইরানকে আঘাত করতে পারে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।” তবে, তিনি যুদ্ধের সময়কাল নিয়েও মিশ্র বার্তা দিয়েছেন। এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই মিত্রদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার উপর তাদের প্রভাবের উপর নির্ভর করবে।





